বৈধ-অবৈধ পথে ভারতে যাচ্ছে বিপুল অর্থ
বৈধ বাণিজ্য সম্পর্কের বাইরেও বিভিন্ন উপায়ে বাংলাদেশ থেকে ভারতে মুদ্রা স্থানান্তরের ঘটনা ঘটছে। চাকরির আয়ের রেমিট্যান্স, ভ্রমণ ও চিকিৎসা ব্যয়, এমনকি বিলাসপণ্য, প্রসাধনসামগ্রী, নেশাজাতীয় পণ্যের অবৈধ চোরাচালানের মাধ্যমে প্রতিবছর বড় অংকের অর্থ ভারতে চলে যাচ্ছে। এই অবৈধ অর্থ পাচারের কোনো নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান না থাকলেও ধারণা করা হচ্ছে, বৈধ লেনদেনের সমপরিমাণ বা তার চেয়েও বেশি মুদ্রা অনিয়ন্ত্রিতভাবে দেশ ছাড়ছে, যা দেশের অর্থনীতির জন্য নীরব কিন্তু গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যে দেখা যায়, প্রতিবছর বাংলাদেশ থেকে পাঁচ থেকে ছয় কোটি ডলার অর্থ রেমিট্যান্স আকারে ভারতে যায়। ২০২০-২১ অর্থবছরে পাঁচ কোটি ৫৫ লাখ ডলার, ২০২১-২২ অর্থবছরে চার কোটি ৪০ লাখ ডলার, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ছয় কোটি এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে পাঁচ কোটি ৫৬ লাখ ডলার রেমিট্যান্স আকারে দেশটিতে গেছে।
তবে বাস্তবে এই অর্থের পরিমাণ কাগজে-কলমের কয়েকগুণ হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কারণ যেসব ভারতীয় নাগরিক বাংলাদেশের বিভিন্ন সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন তাদের বেশিরভাগই ঘোষণার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি অর্থ বেতন-ভাতা হিসেবে পেয়ে থাকেন। সে অর্থ নানাভাবে ভারতে চলে যায়।
বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) সূত্র জানায়, ২০১৮-১৯ অর্থবছর থেকে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে আট হাজার ১৬১ জন ভারতীয় নাগরিকের অনুকূলে নতুন কর্মানুমতি ইস্যু করা হয়েছে। অপরদিকে ইস্যুকৃত নতুন কর্মানুমতির বিপরীতে ১৩ হাজার ৭৬৮টি কর্মানুমতির মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। তবে কর্মানুমতি ছাড়াও অনেক ভারতীয় নাগরিক বাংলাদেশে বসবাস করছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান। বিভিন্ন সময় অভিযানে অবৈধভাবে বসবাসরত ভারতীয় নাগরিক পুলিশের হাতে গ্রেপ্তারের খবর পাওয়া যায়।
তথ্যানুযায়ী, বর্তমানে ৫০ হাজারের মতো ভারতীয় নাগরিক বাংলাদেশে বসবাস করছেন। এদের মধ্যে ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়া কিংবা ভিসার শ্রেণি পরিবর্তনের তথ্য হালনাগাদ না করার জন্যও অবৈধ হয়েছেন অনেকে। ২০২৪ সালের ১৮ নভেম্বর থেকে বাংলাদেশে বসবাস করা অবৈধ নাগরিক শনাক্ত ও তাদের বিরুদ্ধে বিশেষ অভিযান চালায় পুলিশের বিশেষ শাখা। ওই অভিযানে অবৈধভাবে বসবাসকারী হিসেবে ছয় হাজার ৯৭ জন বিদেশি নাগরিককে চিহ্নিত করা হয়। এদের মধ্যে তিন হাজার ৩৯৯ জনই ছিল ভারতীয়।
এদিকে বিদেশি কর্মীদের কর্মানুমতি প্রদানে ১১ সদস্যবিশিষ্ট একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটি রয়েছে। বিডার নির্বাহী সদস্য (ইন্টারন্যাশনাল ইনভেস্টমেন্ট প্রমোশন) কমিটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমানে দায়িত্বে থাকা শাহারুল হুদা বিদেশি কর্মী নিয়োগের বিষয়ে আমার দেশকে বলেন, পৃথিবীর কোনো স্বাধীন সার্বভৌম দেশ চায় না তাদের দেশে বিদেশিরা কাজ করুক। আমাদের দেশের অবস্থানও ভিন্ন নয়। কিন্তু কিছু কিছু ক্ষেত্রে আমাদের বিশেষজ্ঞ লোকের অভাব রয়েছে। এ জন্য আমাদের বিদেশি লোকদের কর্মানুমতি দিতে হয়। যথেষ্ট যাচাই-বাছাই করেই আমরা বিদেশি জনবল নিয়োগের অনুমতি দিয়ে থাকি। বিদেশি কর্মীদের কর্মানুমতি পাওয়ার ক্ষেত্রে যেসব শর্ত রয়েছে সেগুলো পরিপালন হলেই কেবল অনুমতি দেওয়া হয়। তিনি বলেন, প্রাথমিকভাবে সর্বোচ্চ এক বছরের জন্য অনুমতি দেওয়ার নিয়ম রয়েছে। কিন্তু আমরা অনেক সময় ছয় মাসের কর্মানুমতি দিয়ে এ সময়ের মধ্যে নিয়োগদাতা প্রতিষ্ঠানকে বিকল্প দক্ষ জনবল তৈরির তাগিদ দিয়ে থাকি। কিন্তু তারপরও নানা কারণেই নতুন কর্মানুমতির অনুমোদন দিতে হয়।
বিদেশি কর্মীদের ঘোষিত বেতনের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি বেতন-ভাতা দেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে শাহারুল হুদা বলেন, এটা দেখার জন্য সরকারের বিভিন্ন সংস্থা রয়েছে, তারা এটা তদন্ত করে দেখতে পারে। আমাদের পক্ষে এটা যাচাই করা সম্ভব নয়।

Comments
Post a Comment