এ কী খেল দেখাচ্ছে ইরান!
ইরানের 'মোজাইক ডিফেন্স': সমরবিদ্যার নতুন সমীকরণ ও সংকটে পশ্চিমা বিশ্ব
নিজস্ব প্রতিবেদক: মধ্যপ্রাচ্যের রণক্ষেত্রে ইরান এখন এমন এক সামরিক কৌশলে লড়াই করছে, যা আধুনিক যুদ্ধের ইতিহাসে বিরল। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মতো বিশাল সামরিক শক্তির বিরুদ্ধে সরাসরি সম্মুখ সমরে না গিয়ে ইরান নিজেকে সাজিয়েছে 'মোজাইক ডিফেন্স' বা খণ্ড খণ্ড প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায়। এই কৌশলের কাছে খোদ মার্কিন বাহিনীও হিমশিম খাচ্ছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে।
মোজাইক ডিফেন্স কৌশলটি আসলে কী
মোজাইক যেমন অনেকগুলো ছোট ছোট টাইলসের সমন্বয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ শিল্পকর্ম, ইরানের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও ঠিক তেমনি। সাধারণ যুদ্ধে কেন্দ্রীয় কমান্ড বা শীর্ষ নেতাকে হত্যা করলে পুরো সেনাবাহিনী ভেঙে পড়ে। কিন্তু মোজাইক ডিফেন্সে ইরানের প্রতিটি ইউনিট সম্পূর্ণ স্বাধীন। এখানে কমান্ড সেন্টার বা সদর দপ্তর ধ্বংস হলেও নিচের দিকের প্রতিটি ইউনিট বা ফিল্ড কমান্ডার নিজেদের সিদ্ধান্তে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারেন। অর্থাৎ, এটি এমন এক শরীর যার মাথা কেটে ফেললেও প্রতিটি অঙ্গ স্বাধীনভাবে কাজ করতে সক্ষম।
আইআরজিসি-র ৩১টি স্বাধীন ইউনিট
ইরাক যুদ্ধের অভিজ্ঞতা থেকে ইরান বুঝতে পেরেছিল যে ভবিষ্যতে তারা হামলার লক্ষ্যবস্তু হতে পারে। তাই তারা পুরো প্রতিরক্ষা বাহিনীকে ৩১টি প্রাদেশিক ইউনিটে ভাগ করেছে। প্রতিটি ইউনিট লজিস্টিক এবং অপারেশনের দিক থেকে স্বয়ংসম্পূর্ণ। শীর্ষ নেতৃত্ব বা প্রতিরক্ষামন্ত্রীর নির্দেশ ছাড়াই তারা নিজেদের টার্গেটে আঘাত হানতে পারে। সম্প্রতি ওমান বা সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো জায়গায় ইরানের হামলার ধরণ দেখে বিশ্লেষকরা বলছেন, এগুলো মূলত ফিল্ড কমান্ডারদের তাৎক্ষণিক স্বাধীন সিদ্ধান্তের ফসল।
নেপথ্যে চীন ও রাশিয়ার গোয়েন্দা সহযোগিতা
ইরানের এই নিখুঁত ও স্বাধীন আক্রমণের পেছনে রয়েছে শক্তিশালী রিয়েল টাইম গোয়েন্দা তথ্য। বিশ্লেষকদের মতে, চীনের স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ক থেকে সেকেন্ডে সেকেন্ডে তথ্য পৌঁছে যাচ্ছে তেহরানের কাছে। চীনের জন্য ইরান কেবল মিত্র নয়, বরং জ্বালানি নিরাপত্তা এবং 'বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ'-এর প্রধান অংশীদার। এছাড়া রাশিয়ার শীর্ষ বিশ্লেষকদের মতে, পশ্চিমা শক্তির সঙ্গে আর কোনো আলোচনার পথ খোলা নেই জেনে ইরানকে নেপথ্যে সব ধরণের সামরিক ও কৌশলগত রসদ জুগিয়ে যাচ্ছে চীন-রাশিয়া অক্ষ।
রণক্ষেত্রের বর্তমান চিত্র ও অর্থনৈতিক প্রভাব
৫ মার্চ পর্যন্ত পাওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ইরান এখন সরাসরি ইসরায়েলের চেয়ে মধ্যপ্রাচ্যে থাকা মার্কিন ও পশ্চিমা সামরিক স্বার্থের ওপর বেশি আঘাত হানছে। একদিনেই সংযুক্ত আরব আমিরাতে ৭টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ১৩১টি ড্রোন ছুড়েছে ইরান, যা সমরবিদদের হিসাব ওলটপালট করে দিয়েছে। এই উত্তেজনার ফলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম হু হু করে বেড়ে গত এক বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। সামরিক বিশ্লেষকরা ধারণা করছেন, এই যুদ্ধ আগামী সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।
পশ্চিমাদের অসহায়ত্ব
ইরানের এই 'মাথাবিহীন' ও বিকেন্দ্রীভূত আক্রমণের মোকাবিলা করতে যুক্তরাষ্ট্র এখন ব্রিটেনসহ অন্যান্য মিত্রদের সাহায্য চাইছে। পশ্চিমা সামরিক নীতিনির্ধারকরা একান্তে স্বীকার করছেন যে, এই পদ্ধতিতে ইরানকে পরাজিত করা প্রায় অসম্ভব। কারণ কোনো নির্দিষ্ট সদর দপ্তর বা নেতাকে ধ্বংস করে এই যুদ্ধের সমাপ্তি টানার সুযোগ ইরান রাখেনি। ইরানকে পুরোপুরি পরাজিত করতে হলে পশ্চিমার দেশগুলোকে এক অনন্তকালীন বা দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে হবে।

Comments
Post a Comment