ইফতারের পরপরই ধূমপান: শরীরের জন্য এক নীরব ঘাতক
ইফতারের পরপরই ধূমপান: শরীরের জন্য এক নীরব ঘাতক
পবিত্র রমজান মাসে দীর্ঘ ১৫-১৬ ঘণ্টা সিয়াম সাধনার পর যখন আমাদের শরীর ইফতারের মাধ্যমে পুনরুজ্জীবিত হতে চায়, তখন অনেক ধূমপায়ীই প্রথম সুযোগে সিগারেটে টান দেন। অনেকে মনে করেন, সারাদিনের ক্লান্তি দূর করতে একটি সিগারেট হয়তো প্রশান্তি দেবে। কিন্তু চিকিৎসা বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে, এই অভ্যাসটি কেবল ক্ষতিকর নয়, বরং এটি আত্মঘাতী বা জীবনের জন্য চরম ঝুঁকিপূর্ণ।
সারাদিন অভুক্ত থাকার পর আমাদের শরীরের কোষগুলো পুষ্টি এবং অক্সিজেনের জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল থাকে। এই সময় যখন কেউ ধূমপান করেন, তখন নিকোটিন এবং কার্বন মনোক্সাইড অত্যন্ত দ্রুত গতিতে রক্তে মিশে যায়। সাধারণ সময়ের তুলনায় ইফতারের পরবর্তী সময়ে ধূমপানের বিষক্রিয়া শরীরে কয়েক গুণ বেশি শক্তিশালী হয়ে আঘাত হানে।
ইফতারের ঠিক পরেই ধূমপানের সবচেয়ে ভয়াবহ প্রভাব পড়ে আমাদের হৃদপিণ্ড এবং রক্তসংবহনতন্ত্রের ওপর। দীর্ঘক্ষণ রোজা রাখার ফলে রক্তে পানির পরিমাণ কিছুটা কমে গিয়ে রক্ত ঘন হয়ে থাকে। এই অবস্থায় নিকোটিন রক্তনালীগুলোকে হঠাৎ সংকুচিত করে ফেলে। এর ফলে রক্তচাপ এক লাফে অনেক উঁচুতে উঠে যায়, যা হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোকের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, ইফতারের পর ধূমপান করে অনেকে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন বা বুকে তীব্র ব্যথা অনুভব করেন, যার মূল কারণ হলো হৃৎপিণ্ডে রক্ত চলাচলে হঠাৎ বাধা সৃষ্টি হওয়া।
দ্বিতীয়ত, ফুসফুসের কার্যক্ষমতার ওপর এটি চরম বিপর্যয় ডেকে আনে। সারাদিন রোজা রাখার পর শরীরের প্রতিটি কোষে বিশুদ্ধ অক্সিজেনের প্রয়োজন হয়। কিন্তু সিগারেটের ধোঁয়ার সাথে আসা কার্বন মনোক্সাইড রক্তে অক্সিজেনের জায়গা দখল করে নেয়। একে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় 'হাইপোক্সিয়া' বলা হয়। এর ফলে মস্তিষ্কে অক্সিজেনের সরবরাহ কমে যায়, যার কারণে প্রচণ্ড মাথাব্যথা, ঝিমুনি এবং শারীরিক দুর্বলতা দেখা দেয়।
পাকস্থলী বা হজম প্রক্রিয়ার ওপরও এর প্রভাব অত্যন্ত নেতিবাচক। খালি পেটে হঠাৎ তামাকের ধোঁয়া প্রবেশ করলে পাকস্থলীতে অ্যাসিডের নিঃসরণ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। এটি কেবল মারাত্মক গ্যাস্ট্রিক বা এসিডিটিই তৈরি করে না, বরং নিয়মিত এমনটা করলে পাকস্থলীতে ক্ষত বা আলসার হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দেয়। ইফতারে আমরা যে পুষ্টিকর খাবারগুলো গ্রহণ করি, ধূমপান সেই খাবারগুলো হজম করার স্বাভাবিক প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করে।
দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতির কথা চিন্তা করলে, রমজান মাসে এই অভ্যাসটি ক্যান্সারের ঝুঁকিকেও ত্বরান্বিত করে। কারণ, রোজা রেখে শরীরের ডিএনএ মেরামত বা শরীর নিজেকে পরিষ্কার করার (অটোফ্যাজি) যে সুযোগ পায়, ইফতারের পরপরই ধূমপান করলে সেই প্রক্রিয়াটি বাধাগ্রস্ত হয়। বিষাক্ত টক্সিনগুলো বের হওয়ার বদলে শরীরের গভীরে স্থায়ীভাবে গেড়ে বসে।
পরিশেষে বলা যায়, রোজা আমাদের শরীরকে পরিশুদ্ধ করার সুযোগ দেয়। ইফতারের পরপরই ধূমপান করা মানে হলো সেই পরিশুদ্ধির প্রক্রিয়াকে বিষ দিয়ে ধ্বংস করা। নিজের সুস্থতা এবং পরিবারের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে এই মারাত্মক অভ্যাসটি ত্যাগ করাই বুদ্ধিমানের কাজ। এই রমজান হোক আপনার জন্য ধূমপানমুক্ত জীবন শুরু করার সেরা সুযোগ।
.jpeg)
Comments
Post a Comment